বাংলা দ্বিতীয় পত্রঃ সন্ধি

বাংলা দ্বিতীয় পত্রঃ সন্ধি

কথা বলার সময় অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত উচ্চারণের ফলে পাশাপাশি দুটি ধ্বনি মিলে এক হয়ে যায়, কিংবা একটি ধ্বনি প্রভাবে অন্য ধ্বনিটি বদলে যায় অথবা লোপ যায়। দ্রুত উচ্চারণের ফলে পরস্পর সন্নিহিত ধ্বনির মিলন, পরিবর্তন বা লোপকে সন্ধি বলে।

সন্ধির প্রয়োজনীয়তা

বাংলা ভাষার ব্যবহারিক বৈচিত্রা সাধন এবং প্রয়োগিক সম্ভাবনাসহ সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নিচে সন্ধির প্রয়োজনীয়তাসমূহ আলোচনা করা হলো:

১. শব্দভান্ডারের সমৃদ্ধিতে : সন্ধির মাধ্যমে যেহেতু দুটো স্বতন্ত্র শব্দের একত্রীকরণ ঘটে এবং নতুন অর্থবোধক শব্দ সৃষ্টি হয়। তাই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয় নতুন শব্দ। ফলে ভাষার শব্দসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

২. ব্যবহারিক সুবিধা বৃদ্ধি : এই প্রকিয়ায় দুটি শব্দের একত্রীকরণ ঘটার ফলে শব্দের আকার ছোট হয়। ফলে বাংলা ভাষার ব্যবহারিক সুবধিাও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কাব্যধর্মী গদ্য কিংবা কবিতার ছন্দের মাত্রা-বিন্যাসে সন্ধিবন্ধ শব্দের ব্যবহারিক উপযোগিতা সবচেয়ে বেশি।

৩. শ্রুতিমাধুর্য বাড়ায় : সন্ধির মাধ্যমে সৃষ্ট শব্দের ব্যবহার বা-গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সন্ধিদ্ধ শব্দ বাক্যের গঠনে দৃঢ়তা আনয়ন কজরে পদগুলোর পারস্পরিক বন্ধনকে সুসংহত রুপদান করে। ফলে বাক্য শ্রুতিমাধুর্য গুণ-সম্পন্ন হয়।

৪. উচ্চারণে সহজতা আনয়ন : দুটি ধ্বনির একটি ধ্বনিতে রুপান্তরের ফলে সন্ধিবন্ধ শব্দটির উচ্চারণ সহজ ও দ্রুততর হয়। ফলে ভাষার সাবলীল রুপ ফুটে ওঠে।

৫. ধ্বনির সৌন্দর্য সৃষ্টি : একটি ধ্বনির সঙ্গে আর একটি ধ্বরিন মিলনজাত পরিবর্তনের ফলে শব্দের আকার ছোট হয় এবং এক ধরনের ধ্বনি-সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়।

সন্ধির প্রকারভেদ

সন্ধি প্রধানত তিন প্রকার। যথা-

১. স্বর সন্ধি : স্বরবর্ণে স্বরবণে মিলে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে। যেমন –

  • বিদ্যা+আলয়=বিদ্যালয়,
  • হিম+আলয়=হিমালয় ইত্যাদি।

২. ব্যঞ্জ সন্ধি : ব্যঞ্জন বর্ণের সঙ্গে স্বরবর্ণের কিংবা ব্যঞ্জন বর্ণের সঙ্গে ব্যঞ্জন বর্ণের যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জন সন্ধি বলে। যেমন-

  • বাক্+দান=বাগদান;
  • উৎ+লাস=উল্লাস ইত্যাদি।

৩. বিসর্গ সন্ধি : বিসর্গের সঙ্গে স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জন বর্ণের যে সন্ধি হয় তাকে বিসর্গ সন্ধি বলে। অবশ্য বিসর্গ সন্ধি ব্যঞ্জন সন্ধির মধ্যেই পড়ে। যেমন-

  • আবিঃ+কার=আবিষ্কার;
  • ইতঃ+মধ্যে=ইতোমধ্যে ইত্যাদি।

স্বর সন্ধির নিয়ম

১. অ-কার কিংবা আ-কারের পর অ-কার কিংবা আ-কার থাকলে উভয়ে মিলে আ-কার হয়। আ-কার পূর্ব বর্ণে যুক্ত হয়। যেমন- বিদ্যা+আলয়=বিদ্যালয়। এখানে প্রথম পদের অন্ত্য ‘আ’ এবং দ্বিতীয় পদের আদ্য ‘আ’ মিলে ’আ’ হয়েছে। উক্ত ‘আ’ পূর্ববর্ণে যুক্ত হয়েছে।

উদাহরণ :

  • অন্য+অন্য=অন্যান্য
  • অদ্য+অপি=অদ্যাপি
  • গ্রাম+অঞ্চল=গ্রামঞ্চল
  • হিত+অহিত=হিতাহিত
  • মধ্য+অহ্ন=মধ্যাহ্ন

২. ‘অ’ বা ‘আ’-এর পরে ‘ই’ বা ‘ঈ’ থাকলে উভয়ে মিলে ‘এ’ হয়। অর্থাৎ অ/আ+ই/ঈ=এ। যেমন-

  • শুভেচ্ছা=শুভ+ইচ্ছা।

এখানে ‘শুভ’-এর ‘অ’-এর পরে ’ই’ থাকায় উভয়ে মিলে এ-কার হয়েছে। এ-কার পূর্ববর্ণের যুক্ত হয়েছে।

উদারহরণ:

  • অপ+ইক্ষা=অপেক্ষা
  • স্ব+ইচ্ছা=স্বেচ্ছা
  • গণ+ঈশ=গণেশ
  • পরম+ঈশ্বর=পরমেশর
  • নর+ঈশ=নরেশ

ব্যঞ্জন সন্ধির নিয়ম

১. যদি স্বর বর্ণ কিংবা বর্গের র্ততীয়, চতুর্থ বর্ণ কিংবা অন্তঃস্থ বর্ণ পরে থাকে হালে বর্গের প্রথম বর্ণের স্থলে ওই-বর্গের তৃতীয় বর্ণ হবে। অর্থাৎ ক>গ, চ>জ, ট>ড, ত>দ, প>ব হবে। যেমন-

  • দিক্+অন্ত=দিগন্ত।

এখানে পরে স্বরবর্ণ ‘অ’ থাকায় পূর্ববতী ক-বর্ণের প্রথম বর্ণ ক-এর স্থলে উক্ত বর্গের তৃতীয় বর্ণ ‘গ’ হয়েছে।

উদাহরণ:

  • বাক্+আড়ম্বর=বাগাড়ম্বর
  • বাক্+দান=বাগদান
  • দিক্+ভ্রান্ত=দিগভ্রন্ত
  • ষট্+যন্ত্র=ষড়যন্ত্র
  • জগৎ+ঈশ্বর=জগদীশ্বর

২. এমন কতগুলো ব্যঞ্জন সন্ধি রয়েছে- যেগুলো সুনিদিষ্ট কোনো সূত্র বা নিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় নি। এগুলোকে বলা হয় নিপাতনে সিদ্ধ।

উদাহরণ

  • আ+চর্য=আশ্চর্য
  • আ+পদ=আস্পদ
  • এক+দশ=একাদশ
  • গো+পদ=গোস্পদ
  • তদ্+কর=তস্কর
  • দিব+লোক=দ্যুলোক
  • পতৎ+অঞ্জলি=পতঞ্জলি
  • পর+পর=পরস্পর
  • প্রায়+চিত্ত=প্রায়শ্চিত্ত
  • বন্+প্রতি=বনস্পতি

বিসর্গ সন্ধির নিয়ম

১. সংস্কৃত পদের অন্তে অবস্থিত ‘র’ ও ‘স’ স্থানে বিসর্গের ব্যবহার হয়।

র-জাত বিসর্গ : সংস্কৃত পদের শেষে র-স্থানে যে বিসর্গ হয় তাকে র-জাত বিসর্গ বলে। যেমন- অন্তর>অন্তঃ, পুনর>পনঃ।

স-জাত বিসর্গ: সংস্কৃত পদের শেষে স-স্থানে যে বিসর্গ হয় তাকে স-জাত বিসর্গ বলে। যেমন- মনস্>মনঃ, বয়স>বয়ঃ

২. বর্গের তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম বর্ণ কিংবা অন্তঃস্থ বর্ণ বা ‘হ’ পরে থাকলে অ-কার পরবর্তী স-জাত বিসর্গ স্থানে ও-কার হয়। যেমন-

  • মনোগত=মনঃ+গত।

এখানে বর্গের তৃতীয় বর্ণ ‘গ’ পরে থাকায় অ-কার পরবর্তী স-জাত বিসর্গের স্থলে ও-কার হয়েছে।

উদাহরণ

  • মনঃ+রম=মনোরম
  • মনঃ+যোগ=মনোযোগ
  • সরঃ+বর=বরোবর
  • পুরঃ+হিত=পুরোহিত
  • সদ্যঃ+জাত=সদ্যোজাত

Related posts:

Leave a Reply